সুন্দরবন
বিশ্ব বাঘ দিবসে সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষায় বাঘ সংরক্ষণের আহ্বান
সুন্দরবনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে বুধবার পালিত হয়েছে বিশ্ব বাঘ দিবস। ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বন বিভাগ ও সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দিবসটি উপলক্ষে বাঘ সংরক্ষণে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সুন্দরবন অ্যাকাডেমিক ট্রাস্ট। বন বিভাগ সূত্রে জানায়, দিবসের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আলোচনা সভা ও র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বাঘের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ এলাকায় স্থানীয় বন বিভাগের উদ্যোগে র্যালি, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনও দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস পালিত হচ্ছে বুধবার (২৯ জুলাই)। দিবসটি উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ছিল ১১৪টি। ধারাবাহিক এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বর্তমানে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবুও চোরা শিকার, পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো নানা হুমকি এখনো সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় উদ্বেগ। বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে, যখন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে। তবে গত আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে। এছাড়া উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বাঘের চামড়ার সূত্র ধরে আরও কয়েকটি বাঘ পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত নেই। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী। বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের ব্যবহার, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ-বাঘের সংঘাত কমেছে। এর ইতিবাচক ফল হিসেবে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা দেন। পরে গত ১২ জুলাই সুস্থ হওয়া বাঘিনীকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে বনাঞ্চলের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বন বিভাগ এ ঘটনাকে বাঘ সংরক্ষণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছে। এদিকে বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনে দুই দফা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিস চত্বরে এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘটিকে। গত ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন অফিসের সামনে একটি বাঘিনী কিছুক্ষণ খোলা জায়গায় অবস্থান করে আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। এরপর ২৬ জুলাই সকালে কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকায় টহলরত বন বিভাগের একটি বোটের সামনে একটি বাঘকে নদী সাঁতরাতে দেখা যায়। বোটের শব্দ শুনে বাঘটি মাঝপথ থেকে ফিরে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান সেই বিরল দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, নিজের এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে। তবে এতো কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে বাঘ-মানুষের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের চলাচলও আগের তুলনায় বেড়েছে। আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনের বাঘকে নিরাপদ রাখাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। ফলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে অবাধে বিচরণ করছে এবং বন অপরাধও কমেছে। পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে উপকূলও নিরাপদ থাকবে। বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ রক্ষা করতে হবে। হরিণই বাঘের প্রধান খাদ্য। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাঘের আবাসস্থল রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণী সংরক্ষণ নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, তার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশকে টিকিয়ে রাখা। তাই বিশ্ব বাঘ দিবসে তাদের আহ্বান—চোরা শিকার ও পাচার বন্ধ, খাদ্যশৃঙ্খল সংরক্ষণ, বন ধ্বংস রোধ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিন দিনের ব্যবধানে এবার পূর্ব সুন্দরবনের নদীতে বাঘ সাতরাতে দেখলেন বনরক্ষীরা
তিন দিনের ব্যবধানে এবার পূর্ব সুন্দরবনের নদীতে বাঘ সাতরাতে দেখলেন বনরক্ষীরা। রবিবার (২৬ জুলাই) সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকার নদীতে সাঁতার কেটে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে নদীর অপর পাড়ে যেতে দেখেন তারা। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করীম চৌধুরী জানান, রবিবার (২৬ জুলাই) দুপুরের দিকে চাঁদপাই রেঞ্জের স্মার্ট টীমের বনরক্ষীরা নিয়মিত টহলের সময় সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকার নদীতে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে সাঁতার কেটে নদী পার হতে দেখেন। বাঘটি সাতরে নদী পাড় হয়ে লাফিয়ে সুন্দরবনে উঠে বনের মধ্যে চলে যায়। বনরক্ষীরা বাঘ সাতরানোর বিরল এ দৃশ্যটির ভিডিও ধারণ করেছেন। এর আগে, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রের অফিস আঙ্গিনায় একটি বাঘিনী এসে প্রায় ১৫ মিনিট অবস্থান নিয়ে আপন মনে ঘোরাঘুরি করে আবার সুন্দরবনের মধ্যে চলে যায়। তিনি আরো বলেন, টহলের সময় সচরাচর বাঘ দেখা যায় না। সুন্দরবনে এখন বনজীবী, পর্যটকসহ সাধারণ মানুষের প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সুন্দরবনে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী সাচ্ছন্দে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বন বিভাগের কঠোর নজরদারিতে বন অপরাধ কমে এসেছে। সুন্দরবনে আগের তুলনায় বাঘ ও হরিণের সংখ্যা বেড়েছে বলে ডিএফও জানিয়েছেন।
সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সক্রিয় সদস্য কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ,অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জিম্মি জেলে উদ্ধার
সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সক্রিয় সদস্য কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ; উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জিম্মি জেলে। বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) সকালে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান। সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনায় সুন্দরবন অঞ্চলে সক্রিয় সকল বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। উক্ত অভিযানের প্রেক্ষিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হতে অদ্যাবধি ৪৯ টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ৩১৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১০৮ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগান গোলা ও ২টি ওয়াকি-টকি উদ্ধার এবং ৪২ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়। এসময় দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা মোট ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। এছাড়াও সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন বাহিনী তার সহযোগীসহ সর্বমোট ৭ জন সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক ও সফল অভিযানের ফলে সুন্দরবনে সক্রিয় বিভিন্ন দস্যু বাহিনী বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কোস্ট গার্ডের কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে দস্যুরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ জন সক্রিয় সদস্য দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ প্রেক্ষিতে, গত ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখ বুধবার বিকাল ৫ টায় বাগেরহাটের শরনখোলা থানাধীন সুন্দরবনের তাম্বুলবুনিয়া ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন কলামুলি খাল এলাকায় ডাকাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ জন সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্ট গার্ড এর নিকট আত্মসমর্পণ করে। এসময় তাদের কাছে থাকা ২ টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১ টি দেশীয় পাইপগান, ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ১টি ওয়াকিটকি কোস্ট গার্ড এর নিকট জমা প্রদান করে। এছাড়াও উক্ত সময় ডাকাত সদস্যদের নিকট হতে জিম্মি থাকা ১ জন জেলেকে উদ্ধার করা হয়। আত্মসমর্পণকারী ডাকাত আলামিন হোসেন (৪০) বাগেরহাট জেলার মোংলা থানা, তৈবুর রহমান (২৪) সাতক্ষীরা জেলার তালা থানা এবং মনিরুজ্জামান মামুন (২০) খুলনার জেলার কয়রা থানার বাসিন্দা। বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্য হিসেবে তারা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনে ডাকাতিসহ সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে আসছিল। জব্দকৃত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও আত্মসমর্পণকারী ডাকাতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাসহ পরবর্তী আইনানুগ কার্যব্যবস্থা গ্রহণ এবং উদ্ধারকৃত জেলেকে পরিবারের নিকট হস্তান্তরের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এর নিরলস অভিযান এবং কঠোর অবস্থানের কারণেই সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলো অনেকাংশে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সুন্দরবনের সকল সক্রিয় ডাকাতদের দস্যুবৃত্তি পরিহার করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এর নিকট আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে ইচ্ছুক, আত্মসমর্পণের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ প্রদান করা হবে। অন্যথায়, যারা আত্মসমর্পণ না করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত “জিরো টলারেন্স” নীতির আলোকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ভবিষ্যতে আরও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একইসাথে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। সরকারের নির্দেশনা, আপনাদের সকলের সহযোগিতা এবং অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।
সুন্দরবনে বনরক্ষীর অভিযানে তিনটি নৌকাসহ ২৪ বোতল কীটনাশক ও শুঁটকি তৈরীর চাটাই জব্দ
পূর্ব সুন্দরবনের চরাপুটিয়া টহল ফাঁড়ির শিয়ালা এলাকায় বৃহস্পতিবার সকালে বনরক্ষীরা অভিযান চালিয়ে তিনটি নৌকাসহ ২৪ বোতল কীটনাশক ও শুঁটকি তৈরীর চাটাই জব্দ করেছেন। এ সময় জেলেরা সুন্দরবনে পালিয়ে যায়। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পূর্ব সুন্দরবনের চরাপুটিয়া টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীরা বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে নিয়মিত টহল কালে সুন্দরবনের শিয়ালা এলাকার সাইডখালে তিনটি জেলে নৌকা দেখতে পেয়ে এগিয়ে যায়। বনরক্ষীদের দেখতে পেয়ে নৌকা আরোহী অজ্ঞাত পরিচয়ের জেলেরা নৌকা ফেলে সুন্দরবনের মধ্যে পালিয়ে যায়। পরে বনরক্ষীরা নৌকায় তল্লাশী করে ২৪ বোতল কীটনাশক, তিনটি টোনা জাল ও শুঁটকি তৈরীর চাটাই এবং অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করেন। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে বনরক্ষীরা সুন্দরবনে বিষদস্যুদের একটি অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। অজ্ঞাত পরিচয়ের জেলেরা সুন্দরবনের খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরে বনের মধ্যে মাছ শুঁটকি করার জন্য সরঞ্জাম নিয়ে অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করে। এমনিতে এখন সুন্দরবনে মাছ ধরায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা জারী রয়েছে বলে এসিএফ জানিয়েছেন।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম রক্ষায় শ্যামনগরে ‘লংমার্চ ফর ফরেস্ট’ কর্মসূচি
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া রক্ষা এবং নদীর চরে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধের দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ‘লংমার্চ ফর ফরেস্ট’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ৩০ জুন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় গ্রীন কোয়ালিশন ও শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠন দুটির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে উপজেলার নীলডুমুর এলাকা থেকে শুরু হয়ে লংমার্চটি বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। এতে নেতৃত্ব দেন গ্রীন কোয়ালিশন জেলা সভাপতি আবু আফফান রোজ বাবু এবং শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুদ্দিন সিদ্দীকি। লংমার্চ শেষে আন্দোলনকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বক্তারা বলেন, সুন্দরবন শুধু একটি সাধারণ বন নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত একটি প্রাকৃতিক আশ্রয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় এই বন সবসময় ঢাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। স্মারকলিপিতে আন্দোলনকারীরা উল্লেখ করেন, সুন্দরবনের নদীতে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা বনজ বীজগুলো মূলত নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে। তবে শ্যামনগর উপজেলার নদীবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন সংলগ্ন নদী থেকে ভেসে আসা এসব বনজ ফল ও বীজ সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। নির্বিচারে এই বীজ সংগ্রহের ফলে প্রাকৃতিকভাবে নতুন গাছ জন্মানোর সুযোগ মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে, যা সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মকে বাধাগ্রস্ত করছে। একটি বীজের স্বাভাবিক বিকাশ বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি গাছের ক্ষতি নয়, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে বনপ্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সংকট উত্তরণে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ অবিলম্বে বন্ধ করা; বন টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তা, সিপিজি, ডিসিটি, ভিটিআরটি ও ভিসিএফ সদস্যদের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি করা; জনসচেতনতা তৈরিতে আলোচনা সভা, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং কার্যক্রম চালু রাখা এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণ ও যুব সমাজকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। উক্ত কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সাতক্ষীরা নিজস্ব প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জী, ডিবিসি নিউজের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি এম বেলাল হোসাইন, মানবজমিনের শ্যামনগর প্রতিনিধি জাহিদ সুমন, আমাদের সময়ের শ্যামনগর প্রতিনিধি বেলাল হোসেন, পত্রদুতের উপকূলীয় প্রতিনিধি আব্দুল হালিম, বনজীবী নারী নেত্রী শেফালী বিবি, ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ, বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহীন ইসলাম, স ম ওসমান গনী ও জান্নাতুল নাঈমসহ স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।