মতামত
বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণঃ এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে সর্বমোট ৩৫ হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) রয়েছে। স্তরভিত্তিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুমানিক সংখ্যা নিচে দেওয়া হলো: মাধ্যমিক বিদ্যালয় (হাই স্কুল): সারা দেশে প্রায় ১৯,৭৫৭টি। স্কুল অ্যান্ড কলেজ (উভয় স্তর): প্রায় ১,৩৮২টি। উচ্চমাধ্যমিক কলেজ: ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি মিলিয়ে প্রায় ২,৬৬৪টি। মাদ্রাসা: প্রায় ৯,২৬৫টি। কারিগরি ও ভোকেশনাল: প্রায় ২,২২৫টি। শিক্ষাখাতের সঠিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ও সামগ্রিক ডাটাবেজ তৈরি করতে নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপ ও নিবন্ধন হালনাগাদ করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে অর্ডার)। ব্যানবেইসের (BANBEIS) বাৎসরিক প্রতিবেদনে এসব বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কে? এমপিওভুক্ত শিক্ষক হলেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) শিক্ষক যারা সরকারের কাছ থেকে মাসিক বেতন-ভাতা পান। “এমপিও” (MPO) এর পূর্ণরূপ হলো “মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার” (Monthly Payment Order), যা দ্বারা এই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পান। বাংলাদেশে শিক্ষার ৯৩ শতাংশই বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে,দীর্ঘমাসাধিককাল সময় ধরে ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মানুষের কাতারেই পড়েন না! তাদের দাবিদাওয়া বলতে কিছুই নেই বা থাকতে পারে না। অথচ আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা বলতেই বুঝায় বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা। সরকারী মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। অন্যদিকে, দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোর ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। স্বল্প বেতনে বাড়ি হতে অনেক দূরে গিয়ে তাদের চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা না থাকা এমন মানুষদের চাকরি এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরপুর। তাই এমপিও সিস্টেম রাখাটা কতোটুকু যুক্তিসংগত তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটি হিসেবে দেখা যায়- যদি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের বেতনের পুরো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নেয় তাহলে সরকারের লাভ বেশী হতো। এমনিতেই বেসরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে বেতন স্কেলের শতভাগ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। এছাড়াও আছে বাড়ি ভাড়া আর সামান্য মেডিক্যাল ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা। আমরা বেসরকারি শিক্ষকগণ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার পর জাতীয়করণের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক বিশৃঙ্খলার বদনামতো আছেই। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে যত্রতত্র অর্থ আদায়ে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি ব্যবসায়িক পণ্য পরিণত হয়েছে। জাতীয়করণ হলে শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগর শিক্ষকগণ লাভবান হবে না শুধু জাতিও লাভবান হবে। তারা তাদের দোরগোড়ায় পছন্দের সরকারি স্কুল-কলেজ পাবে সাথে তাদের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে। ছাত্রছাত্রীদের হতে আদায়কৃত অর্থসহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় রাষ্ট্রিয় কোষাগারে নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নিলে এটাই হবে জাতীয়করণের সহজ সরল কাজ। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা, এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। অথচ একই কারিকুলামের অধীন একই সিলেবাস, একই অ্যাকাডেমিক সময়সূচি, একইভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত থেকেও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে এক বড় ধরনের বৈষম্য। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেলের একধাপ নিচে দেওয়া হয়। তাছাড়া উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও সহকারি প্রধানদের বেতন স্কেল সমান হওয়ায় সহকারি প্রধান মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ভাতা এখনো সরকারি অনুদান থেকে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের বেতন ভাতা কখন ছাড় হবে তা জানার জন্য সংবাদ মাধ্যমের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বেতনের খবর এক তারিখের মধ্যে প্রচারিত হলেও ব্যাংকে জমা হতে মাসের ১০/১২ তারিখ চলে যায়। তারপরে পরিচালনা পর্ষদ সভাপতির দস্তখতসহ বেতন বিল তৈরি করে ব্যাংকে জমা দিতে আরো এক সপ্তাহ লেগে যায়। তাই বেসরকারি শিক্ষকদের পকেটে বেতনের টাকা আসতে মাসের বিশ তারিখ হয়ে যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগরদের বেতন এখনো অনুদান সহায়তা- এটা তাদের জীবনে এক ধরনের ‘চলিতেছে সার্কাসে’র মতো। বেসরকারি শিক্ষকরা এমনিতেই এমপিও সিস্টেমের জটিল নিয়মের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। একজন শিক্ষক ইচ্ছা মতো তাদের পছন্দের বাড়ির কাছের প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে পারছেন না। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরে যাওয়ার পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী টাকা পাওয়ার আগেই অর্থাভাবে বিনাচিকৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া কয়েক বছর ধরে কোনও ধরনের সুবিধা না দিয়েই অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট খাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ কাটা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। ১৯৭৩ সালে একটি যুদ্ধবিধস্ত দেশে প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমকি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। ১৯১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয় । এ অবস্থায় দেশ ও জনগণের স্বার্থে দ্রুত জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়ন, শিক্ষায় বিনিয়োগে ইউনেস্কো আইএলও’র সুপারিশগুলো বাস্তবায়নসহ সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা জাতীয়করণ প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পাঠ্যক্রম, আইন এবং একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হলেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বেতনের ১০ হারে কেটে রাখলেও বৃদ্ধ বয়সে যথাসময়ে এ টাকা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই। অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা: তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন,আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশ নেত্রী, আপোষহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ওয়াদা করেছিলেন ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান স্যার ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ওয়াদা করেছিলেন বি এন পি রাষ্ট্র পরিচালনা সুযোগ পেলে প্রথম কাজ হবে দেশের এম পি ও ভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জীবন মানের উন্নয়ন করার জন্য চাকরি জাতীয়করণ করা হলে। দীর্ঘদিন আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সমস্যাটি মানবিক কারণে সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করুন। আপনার মানবিক দয়ালু হস্তক্ষেপেই পাঁচ লাখ জীবন স্বাচ্ছন্দময় হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষকদের শ্রম ও মেধার মূল্যায়ন করা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
পে-স্কেল : বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী?
বেসরকারি খাতে কোনো নির্দিষ্ট 'জাতীয় পে স্কেল' নেই, তাই সরকারি চাকরির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পে স্কেল শুরুর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা ইতিহাস নেই। মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নীতি, কাজের ধরন, সক্ষমতা এবং বাজার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল তৈরি ও বাস্তবায়ন করে থাকে। বাংলাদেশে শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যই সরকার নির্ধারিত জাতীয় বেতন স্কেল বা পে-স্কেল চালু রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই সর্বপ্রথম সরকারি কর্মচারীদের জন্য জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করা হয়। এবার, দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই বর্ধিত সুবিধা কার্যকর হতে পারে– এই খবরে বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? সরকারি দফতরে আনন্দের হাওয়া, ঠিক তখনই দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এই মহোৎসবের বিপরীতে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? নতুন পে-স্কেলের আলো কি কোনোভাবেই পৌঁছাবে বেসরকারি খাতে? নাকি তারা পাবেন শুধু নতুন করে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির? বিভন্ন তথ্য অনুযায়ী, এবারের পে-স্কেল একযোগে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে সংশোধিত মূল বেতনের একটি অংশ এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাতা সমন্বয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির আশা করা হলেও, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধরে রাখা বেসরকারি খাতের কর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে: শিল্প, তৈরি পোশাক, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও গণমাধ্যমসহ অর্থনীতির সব প্রধান চালিকাশক্তিই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো সমন্বিত চাকরি-নীতিমালা, সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো কিংবা কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কয়েক বছর আগে বেসরকারি খাতের জন্য একটি খসড়া ‘সার্ভিস রুলস’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ঝড় উঠেছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি–সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম কর্মসংস্থানের মানদণ্ড, চাকরির নিরাপত্তা, উৎসব ভাতা ও সার্বিক শ্রমবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেলের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত হলেও বেসরকারি খাতের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সুবিধার রূপরেখা এই মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি কর্মীদের সুরক্ষায় শ্রম নীতিমালা সংস্কারের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারে। পে-স্কেল: সচিব কমিটির সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হলো সরকারি পে-স্কেল সরাসরি বেসরকারি খাতের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে সরকারি বেতন বৃদ্ধি পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মীদের বেতন, মহার্ঘ ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। গত পে-স্কেলগুলোতে সরকারি কাঠামো ঘোষণার পর বেসরকারি খাতে যে সুবিধাগুলো সাধারণত প্রসারিত হয়েছে: মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি: সরকারি কাঠামোতে মূল বেতন বাড়ার কারণে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং প্রারম্ভিক মূল বেতন সমন্বয় করতে বাধ্য হয়। ভাতা সমন্বয়: সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও টিফিন ভাতা বৃদ্ধির পর বেসরকারি খাতের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোও কর্মীদের জন্য এই ভাতাগুলো বাড়িয়ে থাকে। বোনাস ও প্রণোদনা: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসব বোনাস ও বিশেষ সুবিধার প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতেও। এমপিওভুক্ত শিক্ষক: সরকারি পে-স্কেলের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত (MPO) শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও গ্র্যাচুইটি: নতুন পে-স্কেলে সরকারি পেনশনের হার ও গ্র্যাচুইটি বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মীরাও বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং টার্মিনেশন বেনিফিট পাওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো দাবি উত্থাপন করতে পারেন। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কী বাংলাদেশে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার, বেসরকারি চাকরিজীবীরাও কী সুবিধা বর্তমানে কার্যকর নবম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নিয়মিত ও বিশেষ সুবিধা বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেতে পারেন এটাই সবার প্রত্যাশা। একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : নতুন অধ্যয়ের সুচনা
চীন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। বাংলাদেশ—চীন সম্পর্ক প্রাচীন ও প্রায় তিন হাজার বৎসরের পুরোনো। বাঙালি সভ্যতা ও চীনা সভ্যতার মাঝে খ্রিষ্টের জন্মেরও হাজার বৎসর আগে থেকে যোগাযোগ আছে। প্রাচীনকাল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে চীন এবং বাংলায় মানুষের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে চীন বাংলাদেশর আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়নের এক অন্যতম অংশীদার চীন এবং বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক পক্ষ। সম্প্রতি ২০১৭ সালেপ্রধানমন্ত্রীর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের ২ জানুয়ারি প্রথম বিদেশ সফর ছিল চীনে। ২০০২ সালে জোট সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া চীন সফর করেন। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজির সঙ্গে দেখা করেন এবং এক চীন নীতির প্রতি সমর্থন জানান। চীন সফর কূটনীতির কৌশলগত পরিবর্তন : প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। অতীতে ভারত কেন্দ্রিক প্রাধান্য থেকে সরে এসে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্র নীতিতে একে কৌশলগত পরিবর্তন বলে মনে করেন তারা। কারণ চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান অংশ চীনকেন্দ্রিক। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে চীন সফর জরুরি ছিল বলে মনে করেন কূটনীতিকরা চীন সফর কূটনীতির কৌশলগত পরিবর্তন কূটনীতির কৌশলগত পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। অতীতে ভারত কেন্দ্রিক প্রাধান্য থেকে সরে এসে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্র নীতিতে একে কৌশলগত পরিবর্তন বলে মনে করেন তারা। কারণ চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান অংশ চীনকেন্দ্রিক। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে চীন সফর জরুরি ছিল বলে মন হয়। বিএনপি সরকারের সঙ্গে অতীতে চীনের সম্পর্কে কয়েকবার টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বিএনপি কয়েক বছর আগে থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন কিংবা চীনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার একটা কৌশল নেয়। অতীতে তাইওয়ান ঘিরে ঢাকার অবস্থান বিএনপি সরকারকে বিপাকে ফেলে দেয়। আবার ২০২১ সালে চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ঘিরে বিএনপি বিবৃতি দেয়। সেটি নিয়েও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিরোধ ঘটে। তবে এবার বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে ‘এক চীন নীতি’-কে স্বীকৃতি দেয়। সেটি সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলগত অবস্থান। যৌথ ঘোষণাতেও দুই দেশ একে অপরের মৌলিক স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ পুনর্ব্যক্ত করে যে বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। ‘সরকার ঐ সময় একটা ভুল করে বসেছিল, কিন্তু সেই ভুল থেকে তারা দ্রুত বেরিয়েও এসেছে। আর সেই ভুলটাকে মনে করিয়ে দেওয়াতে চীনেরও কোনও স্বার্থ নেই। চীনের স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোতে। আর বাংলাদেশ যেহেতু ঐ অবস্থান থেকে সরেই এসেছে, এ বিষয়ে তাদের আর চাওয়ার কিছু নেই। সুতরাং এটা নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। এখন আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যাতে ভবিষ্যতে আবার একই রকম ভুল না করি। একই ভুল আবার যেন করে না বসি।’ চীন সফরে প্রাপ্তি প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের চীন সফরে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপলে’ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে চুক্তিগুলো সই হয়। মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা এমওইউ সই হয়েছে। তার মধ্যে ১৩টি বাংলাদেশ এবং চীনের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের বিভিন্ন গভর্নমেন্টের মিনিস্ট্রি টু মিনিস্ট্রি সই হয়েছে। আর তিনটি হয়েছে বাংলাদেশের বিডার সঙ্গে চীনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের এবং একটা সই হয়েছে পলিটিক্যাল পার্টি টু পলিটিক্যাল পার্টি অর্থাৎ দুটি দেশের বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন বলেন - গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান সই হয়েছে। এছাড়া টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে সহযোগিতায় দুটি পৃথক এমওইউ এবং বাংলাদেশ থেকে জাতীয় ফল কাঁঠাল রফতানি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। যৌথ ইশতেহারে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ-চীন একটি যৌথ ইশতেহার তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পক্ষ বিশ্বাস করে চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের সুযোগ বয়ে আনবে। নতুন যুগে দুই দেশ ও দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি সুফল বয়ে আনতে উভয়পক্ষ তাদের ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ বা ‘সামগ্রিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে’ আরও এগিয়ে নিয়ে যৌথভাবে ‘চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভাগ্যের কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে। উভয়পক্ষ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারা বজায় রাখতে, শাসন পরিচালন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়াতে এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি কৌশলগত সংলাপের ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে। এ ছাড়া কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ ব্যবস্থার পথ খোঁজার বিষয়েও উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। শিক্ষা জনশক্তি উন্নয়নে, সামাজিক উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি গবেষণায় চীনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব কিছু মিলিয়ে চীনের সঙ্গে আমাদের বহুদিন ধরে যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব; সেই সম্পর্কটাকে আর নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এই সফরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনেকে মনে করেন, এই সফরে ১৭টির মতো চুক্তি, প্রটোকল অথবা স্মারক সই হয়েছে এবং সেগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। আমি মনে করি, এই চুক্তিগুলো আমাদের দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করতে জোরালো ভূমিকা রাখবে। সেজন্য আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী এই সফরটা অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আমাদের পররাষ্ট্র-সম্পর্কের অগ্রগতির নতুন দুয়ার উন্মোচন হবে, এবং নতুন নতুন ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা এগিয়ে যাবে।’ এটাই সবার প্রত্যাশা। সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকসেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
ডিগ্রীর কারখানায় জ্ঞানের মৃত্যু
আজ শিক্ষক দিবস। কিন্তু এ দিনে শ্রদ্ধার ফুলের চেয়ে বেশি জরুরি প্রশ্ন করা—এই শিক্ষাব্যবস্থায় আসলে আমরা কী উদযাপন করছি? যে দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের প্রথম পাঁচশোর তালিকায় নেই, যে দেশে স্নাতক ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে না, যে দেশে শিক্ষকরা জ্ঞান নয়, প্রশাসনের অনুমোদনে বাঁচেন—সে দেশে শিক্ষক দিবস এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। আমরা উৎসব করছি, অথচ শিক্ষার মান তলানিতে নেমে গেছে। জ্ঞানের চর্চা হারিয়েছে, কেবল ডিগ্রি বেচাকেনা চলছে। শ্রেণিকক্ষ এখন আর চিন্তার ক্ষেত্র নয়, বরং চাকরির প্রশিক্ষণকেন্দ্র। শিক্ষক দিবস তাই উদযাপনের নয়, লজ্জা ও প্রতিবাদের দিন। একদিকে শিক্ষানীতির নামে ব্যবসা, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্ধ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের সংঘর্ষে বাঙলাদেশের শিক্ষা আজ নিস্পৃহ, জীর্ণ, পরাজিত এক প্রতিষ্ঠান।