উন্নয়নের গতিপথে বিকেন্দ্রীকরণের অপরিহার্যতা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

রাষ্ট্রের উন্নয়ন কার্যক্রমকে কার্যকর, জনবান্ধব ও টেকসই করতে প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়ন ও সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি। নাগরিকদের জন্য প্রদেয় জনসেবার মান উন্নয়ন, সেবাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা—এসব লক্ষ্য অর্জনে একটি দক্ষ ও বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো মূলত কেন্দ্রনির্ভর, যা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বাংলাদেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে প্রণীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা কিংবা স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর প্রায় সবই কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহীত হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়ন—সবকিছুই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড একটি অতিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যেখানে স্থানীয় বাস্তবতা, বৈচিত্র্য ও চাহিদার যথাযথ প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

 

অতিকেন্দ্রীকরণের এই প্রবণতা কেবল উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি ও কার্যকারিতাকেই ব্যাহত করছে না; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের ক্ষেত্রেও অন্তরায় সৃষ্টি করছে। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রয়েছে, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয়ের অপচয় এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তাই উন্নয়নকে গণমুখী ও বাস্তবমুখী করতে হলে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

 

বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে নীতিগত বক্তব্য, প্রস্তাব এবং আংশিক উদ্যোগ দেখা গেলেও কার্যকর ও টেকসই কোনো কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮০-এর দশকে উপজেলা পরিষদ গঠনের উদ্যোগকে এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রবণতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা পায়নি। ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

 

বাস্তবতা হলো, একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। বিকেন্দ্রীকরণ মানে কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সেবাদানের ক্ষেত্রে বাস্তব ক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বাড়বে, অন্যদিকে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।

 

এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট প্রণয়ন, কর আহরণ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত না করা হলে প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিমালা ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কার্যকর তদারকি কাঠামো।

 

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বিকাশ ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা বিদ্যমান। এসব অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে নতুন করে কোনো কমিশন গঠন বা আনুষ্ঠানিকতা সৃষ্টির চেয়ে অধিক জরুরি হলো—বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ। নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব উদ্যোগে রূপান্তর করতে পারলেই কেবল বিকেন্দ্রীকরণের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।

 

অবশেষে বলা যায়, উন্নয়নকে যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং জনগণমুখী করতে হয়, তবে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ আর কোনো বিকল্পহীন ধারণা নয়—এটি এখন অপরিহার্য বাস্তবতা। কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, ক্ষমতার সুষম বণ্টন এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই কেবল একটি শক্তিশালী ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।

 

এখন দেখার বিষয়—নতুন সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং বাস্তব পদক্ষেপ নিতে কতটা আন্তরিকতা প্রদর্শন করে।

 

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com