গাজামুখী সুমুদ ফ্লোটিলা: ৩৯ নৌযান আটক করল ইসরায়েল, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৪৮ পিএম
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা (Global Sumud Flotilla / GSF)
আজ বিশ্ব মানবতা মুখ থুবরে পড়ে আছে ইসরাইলি উপত্যাকায়। শুধু দুঃখ প্রকাশ করে নিশ্চুপ বিশ্বনেতারা। শুধু নিন্দা প্রকাশ ছাড়া আর কিছু করার ক্ষমতা নেই কি কারও।
সুমুদ ২০২৫ সালে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক নৌ বহর, যার লক্ষ্য গাজার ওপর ইসরায়েলের নৌ অবরোধ ভাঙা এবং সরাসরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। “সুমুদ” শব্দটি আরবিতে “অটলতা, দৃঢ়তা” অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি বেশ কয়েকটি সংগঠন মিলিতভাবে পরিচালিত, যেমন Freedom Flotilla Coalition, Global Movement to Gaza, Maghreb Sumud Flotilla, Sumud Nusantara ইত্যাদি। নৌ বহরটি আগেই কয়েকটি ইউরোপীয় ও মধ্য প্রদেশ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, যার মধ্যে স্পেন, ইতালি, গ্রিস, তিউনিসিয়া ইত্যাদি জায়গা ছিল। বহরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, পরিবেশবাদী ও সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী সহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
নৌ অবরোধ (Naval Blockade of Gaza)
ইসরায়েল দীর্ঘ দিন ধরে গাজার উপকূলীয় জলসীমায় নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে, এমনভাবে যে, কোনও নৌজাহাজ সরাসরি গাজার দিকে যাওয়া যেন দুরূহ হয়। ইসরায়েলের যুক্তি হলো: তারা এই অবরোধকে “নিরাপত্তা বাহক” হিসেবে দেখায়, যাতে গাজার মধ্যে অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম প্রবেশ বাধা দেওয়া যায়। বিরোধীরা বলছেন, এই অবরোধ গাজার সাধারণ জনসংখ্যাকে হুমকির মুখে ফেলেছে — বিশেষত মানবসমাজের মৌলিক অধিকার ও জরুরি সাহায্য পৌঁছানো ক্ষেত্রে।
ইসরায়েলি নৌ অভিযান
-ERVED প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইসরায়েলি নৌবাহিনী অন্তত ৩৯টি নৌযান আটক করেছে। আটক অভিযানটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটেছে — অর্থাৎ গাজার সমুদ্রসীমার বাইরে। অভিযানের সময় যোগাযোগ উপকরণ (যেমন মোবাইল, ক্যামেরা, লাইট, জিপিএস) ব্যাহত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযানে অধিকারকর্মীদের নৌজাহাজে করে তল্লাশি, নেমে আটক ও বহরে নাবিকীয় কর্মীরা ঢুকে নিয়েছে — সাথে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আটককৃতদের অধিকাংশকে আশদোড বন্দরে (Ashdod Port, ইসরায়েলে) নেওয়া হয়েছে, এবং পরে বিতাড়নের (deportation) প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসরায়েল বলেছে যে অভিযানে কোনো বড় ধরনের শারীরিক আঘাত বা লড়াই হয়নি — তারা দাবি করে যে সবকিছু “সাধারণ ও শান্তিপূর্ণভাবে” পরিচালিত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা
গ্রীনল্যান্ডের পরিবেশ বিজ্ঞানী ও কার্যকরী ক্যাম্পেইনার গ্রেটা থুনবার্গ সহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও বহরে ছিলেন এবং তাদের আটক করা হয়েছে। একটি জাহাজ — “Mikeno” নামক — ট্র্যাকারে দেখা গেছে গাজার উপকূলের দিকে যেতে পারেছে, তবে ইসরায়েল দাবি করেছে, সে জাহাজ আটক হয়েছে এবং কোনো জাহাজ গাজা পৌঁছায়নি। অভিযানে “ওয়াটার ক্যানন” বা “ব্রামিং” (ship ramming) করার অভিযোগ উঠেছে, যদিও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে।
অন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থা
আন্তর্জাতিক নৌ আইন (Law of the Sea) অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র সাধারণত অন্য রাষ্ট্রের জাহাজকে আন্তর্জাতিক জলে আটক করতে পারে না, যদি না সে আইনত অনুমোদিত কিছু কারণ থাকে। যুদ্ধকালীন অবস্থা ও নৌ অবরোধ থাকলে, এক দেশে এর নোটিফিকেশন ও কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে — যেমন তল্লাশি ও আটক ব্যবহৃত কাজে ন্যূনতম বল প্রয়োগ করা, ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। অধিকাংশ বিরোধী দল বলছেন, ইসরায়েলের এ ধরনের হার্শ পদক্ষেপ “নিষিদ্ধ নৌ অবরোধের অধীন” এবং “সাংবিধানিক অপরাধ” হতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, আটককৃতরা কীভাবে আচরণ করা হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার রক্ষা হয়েছে কি না — এসব বিষয় অনুসন্ধান হওয়া উচিৎ।
ইসরায়েলি প্রত্যুত্তর ও যুক্তি
ইসরায়েলি যুক্তি: তারা বলেছে যে বহর “যুদ্ধময় এলাকায়” প্রবেশ করার চেষ্টা করছিল, অবরোধ ভাঙার উদ্দেশে ছিল, এবং আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী তারা এটি রুখেছে। এছাড়া, ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা আটককৃতদের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে খেয়াল রাখছে এবং তাদের ইউরোপে বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।অভিযানে বল প্রয়োগের ব্যাপারে ইসরায়েল বলেছে, তাদের অপারেশন “নিরাপদ ও সীমিত” ছিল, কোনো বড় শারীরিক সংঘর্ষ হয়নি
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসরায়েলের এ পদক্ষেপকে তীব্র নিন্দা করেছে। গ্রীসের “March to Gaza” গ্রুপ এটিকে নৌ ডাকাতি (piracy) বলেছে এবং গ্রিস সরকারকে তাদের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছে, এই ধরণের বাধা মানবিক ও নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো ইসরায়েলি কূটনীতিবিদদের বহিষ্কার করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য-বিনিময় সম্পর্ক ক্ষুব্ধভাবে পুনর্বিবেচনা করার কথা বলেছেন। অনেক দেশে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে — রোম, ইস্তানবুল, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি শহরে মানুষ “ফ্রি প্যালেস্টাইন” স্লোগান নিয়ে সমাবেশ করেছে।
কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের দ্রুত রিলিজ ও নিরাপদ প্রেরণের দাবী তুলেছে। বিদেশ মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপ্রধানরা ইসরায়েলে চাপ প্রয়োগ ও কূটনৈতিক নোটাবল প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন।অনেক দেশে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন বা মানবিক নীতির ভিত্তিতে সম্পর্ক সংশোধন করা হতে পারে — যেমন কলম্বিয়ার উদাহরণ।
২০১০ সালে মাভি মারমারা (Mavi Marmara) নামক তুর্কি নৌ বহর ইসরায়েলের কাছে অভিযানে ব্যাপক হিংসা-সংঘর্ষ হয়েছিল, যার ফলে অনেকই নিহত হয়েছিলেন। তৎকালে এবং পরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিরোধ ও তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি ওঠে। আজকের ঘটনার সঙ্গে সেই ইতিহাস কিছুটা মিল খায় — যেমন, রাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক জোরালো প্রতিক্রিয়া, মানবাধিকার ও আইনগত বিতর্ক।
আরও পড়ুন
পল্টনে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও রিক্সা শ্রমিকদের মাঝে ‘ভয়েস অব ইনসাফ ফাউন্ডেশন’ এর ঈদ উপহার বিতরণ
নজরুল জয়ন্তী ও খান খনন উদ্বোধনে ময়মনসিংহ যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
ইরান যুদ্ধে কি হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ, জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প