শ্রমিক
শ্রীপুরে দুই দিনে ১৪৭ পোশাক শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনায়, ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
গাজীপুরের শ্রীপুরে টেপিরবাড়ি এলাকার কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড পোশাক কারখানায় টানা দুই দিনে ১৪৭ শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। শ্রমিকদের অসুস্থ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে সরেজমিন তদন্ত করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভূঞাকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন বিজন মালাকার, জুনিয়র কনসালট্যান্ট ঈশিতা দাস, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) তাসলিমা রহমান, শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) মোসা. আবি ওবাইদা এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন সোনিয়া। কমিটিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, কারখানার কর্মপরিবেশ, খাদ্য ও পানীয়ের মান, বায়ু চলাচল এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকালে কারখানায় কাজ চলাকালে হঠাৎ একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হতে শুরু করেন। প্রথম দিন ৭৭ জন শ্রমিক মাওনা চৌরাস্তার আল হেরা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। গুরুতর কয়েকজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলেও চিকিৎসা শেষে তারা বাড়ি ফিরে যান। পরদিন বুধবার একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭০ জন শ্রমিক অসুস্থ হন। ফলে দুই দিনে মোট ১৪৭ জন শ্রমিক চিকিৎসা নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বুধবার সাময়িকভাবে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হলেও সন্ধ্যায় তা পুনরায় চালু করা হয়। অসুস্থ শ্রমিকরা জানান, তারা হঠাৎ বুকে চাপ অনুভব, মাথা ঘোরা, পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পর কারখানাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারখানা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শ্রমিকদের একটি অংশ কারখানায় ‘অশুভ কিছু’ ঘটেছে বলে দাবি করলে মঙ্গলবার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম এনে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক বা প্রশাসনিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। কারখানার কর্মকর্তা সঞ্জিব কুমার বলেন, ‘শ্রমিকরা কেন অসুস্থ হচ্ছেন, সে বিষয়ে আমাদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। অসুস্থ সবাইকে কারখানার ব্যবস্থাপনায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে এটি ‘মাস হিস্টিরিয়া’ বলে মনে হচ্ছে। একজন অসুস্থ হওয়ার পর মানসিক প্রভাবে অন্যরাও একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হতে পারেন। সাধারণ চিকিৎসায় তারা দ্রুত সুস্থও হয়ে উঠছেন। শ্রমিকদের কাউন্সেলিং এবং কর্মস্থলের পরিবেশ বা কর্মস্থল পরিবর্তনের মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে তদন্ত কমিটি বিষয়টি বিস্তারিত খতিয়ে দেখছে।’ এ ঘটনায় শ্রমিকদের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারখানার কর্মপরিবেশ, খাদ্য, পানীয়, বায়ুর মান কিংবা অন্য কোনো অজানা কারণ দায়ী কি না, তা জানতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রীপুরে দুই দিনে পোশাক কারখানার শতাধিক শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি, কারখানা কর্তৃপক্ষ বলেছে এসব "জ্বীনের আছর"
গাজীপুরের শ্রীপুরে টেপিরবাড়ি এলাকার অবস্থিত কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড পোশাক কারখানায় রহস্যজনক গণঅসুস্থতার ঘটনা দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার অন্তত ৭০ শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার পর বুধবার (৮ জুলাই) সকালেও একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩৫ জন শ্রমিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গতকালকে ৭০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে গুরুতর অসুস্থ ৭জনকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে পাঠানো হয় । দুই দিনে শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হওয়ায় কারখানাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন বা চিকিৎসকরা। এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ওপর এসব ‘জ্বিনের আছর’ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকে কারখানায় কয়েকটি মসজিদের ইমাম এনে দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকরা কুসংস্কারের পরিবর্তে ঘটনার বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কারখানার জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সঞ্জীব বলেন, বুধবার সকাল থেকে উৎপাদন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবার শ্রমিকরা অসুস্থ হতে থাকেন। তাদের ধারণা, এটি ‘জ্বিনের আছর’ হতে পারে। সে কারণেই কয়েকজন ইমাম এনে দোয়া পড়ানো হয়েছে। তবে শিল্প পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, বুধবার সকাল থেকেই একের পর এক শ্রমিক বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, পেটে ব্যথা ও বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসতে থাকেন। মাওনা চৌরাস্তার আল-হেরা হাসপাতাল সূত্র জানায়, বুধবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জন শ্রমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কারখানার সুইং অপারেটর মো. হাবিব বলেন, ‘আজও ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়েছেন। তাদের বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা ও বমি বমি ভাব দেখা দিয়েছে।’ এর আগে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে কারখানার পঞ্চম তলায় প্রথম এক নারী শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বিভাগের আরও শ্রমিক আক্রান্ত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেদিন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং অন্তত ৭০ শ্রমিককে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, গত ২৪ জুন কারখানার শ্রমিক লিজা আক্তারের মৃত্যুর পর থেকেই কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে বিক্ষোভও হয়েছিল। এর মধ্যেই টানা দুই দিনের গণঅসুস্থতা নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শ্রমিক আশিক নুর বলেন, ‘একজন শ্রমিকের মৃত্যুর পরও আমরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাইনি। এখন আবার একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হচ্ছে। আমরা প্রকৃত কারণ জানতে চাই।’ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এবং চিকিৎসা কার্যক্রম তদারকিতে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম আলহেরা হাসপাতালে রয়েছেন। পর্যবেক্ষণ শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুর আলম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। শ্রমিকরা কী কারণে অসুস্থ হচ্ছেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পরপর একজন শ্রমিকের মৃত্যু এবং দুই দিনে শতাধিক শ্রমিকের রহস্যজনক অসুস্থতার ঘটনায় শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় কুসংস্কার বা অনুমানের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। কর্মপরিবেশ, কারখানার বায়ুর মান, সম্ভাব্য রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব, খাদ্য ও পানির মানসহ সব দিক বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শ্রমিকদেরও দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হোক ।
এক লাখ নয় হাজার দুইশত পঁচাত্তরজন শ্রমিক এখন কীভাবে বাঁচবেন?
বিজিএমইএ-এর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত ১৪ মাসে ১৮৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চাকরি হারিয়েছেন ১,০৯,২৭৫ শ্রমিক। এ পরিসংখ্যান আসলে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার ঘোষণা! একেকজন শ্রমিকের হারানো চাকরির পেছনে আছে একটি পরিবারের খাদ্য অনিশ্চয়তা, একটি শিশুর স্কুল থেকে ঝরে পড়া, একটি মায়ের কষ্টে ফেটে যাওয়া হাত, আর এক শ্রমিক নারীর অসমাপ্ত জীবনস্বপ্ন। অথচ রাষ্ট্র শ্রমিকবিরূপ। উপদেষ্টাদের ঠোঁটে ন্যূনতম অনুতাপ নেই, অর্থনীতিবিদরা টেলিভিশনে এখনো ‘ডলার সংকটের’ রুটিন বুলি আওড়াচ্ছেন।