মায়ের হাতের আচার
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
তখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি।আমার ছোট এক ভাই,এক বোন।বাবা লেধে কাজ করতেন।মা ঘরের কাজ করতেন।
একই বাড়িতে আমরা জেঠু এক কাকা থাকি।
একদিন হঠাৎ আমার বাবা পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। বাবার মৃত্যুতে আমরা খুব অসহায় হয়ে পড়ি।
জেঠু কাকারা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন কেউ আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না।
বরং জেঠু কাকারা বিভিন্ন ভাবে চক্রান্ত করে ওই বাড়ি থেকে চলে যেতে বলে।
কিন্তু মা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় আমরা আমাদের স্বামীর ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবো না। আর ছেলে মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবো?কে দিবে আমাদের আশ্রয়?
আমি একদিন মাকে বললাম, আমি আর পড়াশোনা করব না, বাবা যে লেধে কাজ করতেন সেখানেই আমি কাজ করব।
মা বললেন, না তোকে পড়াশোনা করতে হবে পড়াশুনা শিখে ভাই-বোনদের দায়িত্ব নিতে হবে। তোরা চিন্তা করিস না আমি নিজেই লেধে কাজ করে, মানুষের বাড়িতে কাজ করে তোদের প্রতিপালন করব।
তোর পড়াশোনা সব ব্যবস্থা করব। কিন্তু লেধের মালিক মাকে কাজ দিতে অস্বীকার করল। কারখানার সব
ভারী ভারী লোহা যন্ত্রপাতির কাজ মেয়েরা নাকি পারবে না।
তবু মায়ের অনুরোধ আর কাকুতী মিনতিতে এবং আমাদের অবস্থা বিবেচনা করে মাকে লেধে কাজে নেন।
মা লেধের কাজে যাবার আগে খুব সকালে উঠে আমাদের জন্য রান্না করে,জলখাবার তৈরি করে রেখে ,তার পর দুটো বাড়িতে বাসন মাজা ঘর পরিষ্কার করার কাজ করে, পরে মা কারখানায় কাজে যেতন।
কারখানার মালিক খুব ভালো লোক ছিলেন। তিনি মায়ের অবস্থা বুঝে মাকে ক্যান্টিনে খাওয়া তৈরির কাজে নিযুক্ত করেছিলেন।
এভাবে মায়ের কঠোর পরিশ্রমের সামান্য টাকা দিয়েই আমাদের পড়াশোনা এবং খাওয়া-দাওয়া চলে যেত।
কিন্তু একদিন কারখানার মালিক হঠাৎ করে হৃদরোগে মারা যান।
তারপর তার ছেলে লেধ দেখাশুনা করতেন।
তিনি কর্মী ছাঁটাই করেন। মাকেও কাজ থেকে ছাঁটাই করে দিলেন।
আবার আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষা দিব ।ভাই বোনেরা দুজনেই স্কুলে অষ্টম নবম শ্রেণীতে পড়ে।
কি করে আমাদের সংসার চলবে এবং আমরা পড়াশোনা করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।মা খুব চিন্তায় পড়ে যায়।
বাড়তি টাকার জন্য দুটো বাড়িতে রান্না কাজ শুরু করে দেন।
কিছুদিন যাবার পর বৈশাখের শেষে হঠাৎ প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি। সেই ঝড় বৃষ্টিতে অনেক গাছপালা ভেঙে পড়ল। সেইসঙ্গে বাগানে, মানুষের বাড়িতে আম গাছের সব আম ঝরে পড়ে যায়।
সবাই সেসব আমগুলো জড়ো করে ফেলে দেয়। কিছু বাড়িতে রেখে দেয় খাবারের জন্য।
এতো আম দেখে মায়ের মনে নতুন ভাবনা আসে। বস্তা ভর্তি করে ঝরে পরা আমগুলো ঘরে নিয়ে আসেন। আমরা তো সেসব দেখে অবাক হলাম।
মা বলেন, এই আমি দিয়ে আমের আচার তৈরি করব।
তার পর মা আমের আচার তৈরি করা শুরু করে।আমি ঠিক করলাম,সেই আচার প্লাস্টিকের প্যাকেট করে,আমি আর ছোট ভাই দুজনে মিলে দোকানে দোকানে বিক্রি করব ।
আমি প্রথমে মায়ের এই কাজে সম্মতি না জানলেও পরে মায়ের কথা মেনে নিয়ে আমিও কাজে যুক্ত হলাম।
মা দোকান থেকে বিভিন্ন ধরনের মসলা কিনে এনে ভেজে শিল-পাটায় বেটে আচার তৈরি করে প্লাস্টিকের প্যাকেট করে দোকানে দোকানে দিলাম।
প্রথম প্রথমে দোকানদার সেগুলি নিতে রাজি না হলেও মায়ের অনুরোধ এবং আচারের গুণ বুঝে তারা মায়ের তৈরি আচার দোকানে রাখতে রাজি হলেন।
এভাবে ধীরে ধীরে আমের আচার খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল।
কিন্তু সমস্যা আমের সময় তো শেষ হয়ে গেলে আবার কি হবে ? নতুন চিন্তা। এবার তাহলে কি করা যায় ।
মা কিছুতেই দমে যাবার লোক নন। তার মনে সংগ্রামী মানসিকতা, আমাদের মানুষ করা একটা বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল ।
মা আবার বাজার থেকে আদা রসুন বিভিন্ন ধরনের আনাজ ,কাঁচা ফল এনে মিক্সড আচার ,আদা, রসুনের আচার
শুরু করলেন। এবং বিভিন্ন ফল দিয়ে জ্যম জেলি তৈরি করতে শুরু করলেন।
মায়ের হাতের জ্যাম জেলি এবং আচারের গুণ স্বাদ বুঝে এক সহৃদয় ব্যবসায়ী পরামর্শ দিলেন ছোট-বড় প্লাস্টিকের জারে ভরে, এবং আচারের কম্পানির একটি নাম দিয়ে লেভেল তৈরি করে,বিক্রি করতে।
তারপর তিনি নিজেই নাম ঠিক করে দিলেন, "মায়ের হাতের আচার।'"তার নিজস্ব লোকের মাধ্যমে আচারের যার গুলো সংগ্রহের ব্যবস্থা করে দিলেন।
সেই সাথে তিনি আচার কোম্পানির লাইসেন্স বের করে দিলেন। এমনকি তিনি হলেন আমাদের আচারের প্রধান ডিস্ট্রিবিউটর।
তার মাধ্যমে বাজারে আচার বিক্রি শুরু হয় হল।
আমরা ভাই বোন সম্মানের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করলাম। আমি সরকারি স্কুলে চাকরি পেলাম। এভাবেই আমাদের মায়ের সংগ্রামী হাত ধরে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়ালাম।
যে কাকা,জেঠু আমাদের হিংসা করতো, বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতো,একদিন তাদেরই ছেলে-মেয়ে আমাদের আচারে কোম্পানিতে কাজ করে, অর্থ উপার্জন করতে লাগলো।
কিছুদিন পর সরকারি উদ্যোগে খাদ্য প্রদর্শনী হলো ওই ব্যবসায়ীর উদ্যোগে আয়োজিত খাদ্য প্রদর্শনীতে মায়ের হাতের আচার নিয়ে যাওয়া হলো এবং খাদ্য পরীক্ষকদের পরীক্ষায় মায়ের হাতের আচার খাদ্য তালিকায় শ্রেষ্ঠ খাদ্য হিসেবে প্রথম পুরস্কার পেল।
প্রদর্শনী শেষের দিন একটি বড় অনুষ্ঠান করে মাকে মঞ্চে ডেকে সবার সামনে মায়ের জীবনের সংগ্রাম ইতিহাস এবং সংগ্রাম করে কিভাবে একজন মা এভাবে ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারে,সেসব আলোচনা করলো।
খাদ্যমন্ত্রী মায়ের হাতে একটি বড় অংকের টাকার চেক এবং অনেক সামগ্রী তুলে দিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সব মানুষ করতালিতে মাকে অভিবাদন জানালেন। আমরা তিন ভাইবোন দর্শকের আসনে বসে ছিলাম। সেদিন সবার সঙ্গে আমরাও করতালি দিয়ে মাকে অভিবাদন জানালাম। সেদিন আমাদের মন ভরে ছিল মায়ের প্রতি অনেক শ্রদ্ধা ভক্তি, আর দুচোখ ভরে অশ্রু। সে অশ্রু দুঃখ না সংগ্রামের না সফলতার আমরা বুঝতে পারিনি।
চিত্ত রঞ্জন চক্রবর্তী।
শিলিগুড়ি।
ভারত।
আরও পড়ুন
পল্টনে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও রিক্সা শ্রমিকদের মাঝে ‘ভয়েস অব ইনসাফ ফাউন্ডেশন’ এর ঈদ উপহার বিতরণ
নজরুল জয়ন্তী ও খান খনন উদ্বোধনে ময়মনসিংহ যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
ইরান যুদ্ধে কি হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ, জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প